futureforce786.peperonity.com
©copyright 2009-10®
♥.·°´¯`°·.♥●♥.·°´¯`°·.♥
ART.OF.LOVE!
♥.·°´¯`°·.♥●♥.·°´¯`°·.♥
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান-কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা--
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা---
Read 100+ Bengali Poem By 'Read More"!!
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসী-মাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা---
এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে।
ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু ধারে---
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে?
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও---
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥
যত চাও তত লও তরণী-পরে।
আর আছে?--- আর নাই, দিয়েছি ভরে॥
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে---
এখন আমারে লহো করুণা ক'রে॥
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি---
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥
আবার আসিব ফিরে
জীবনানন্দ দাস
আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শাঁখচিল শালিকের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।
হয়তো বা হাঁস কোনো- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কল্মীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলঙ্গীর ঢেউএ ভেজা বাঙ্লারই সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।
হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমূলের ডালে।
হয়তো খৈয়ের ধান সরাতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙ্গা বায়; রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারে পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।
অদ্ভুত আঁধার এক
জীবনানন্দ দাস
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নাই- করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব'লে মনে হয়
মহত্ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
অমলকান্তি
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারতো না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।
আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণে কাক ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামফলের পাতায়
যা নাকি অল্প একটু হাসির মতন লেগে থাকে।
আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে,
চা খায়, এটা ওটা গল্প করে, তারপর বলে, `উঠি তাহলে'।
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ সকলেরি ইচ্ছাপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি, রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।।
বনলতা সেন
জীবনানন্দ দাস
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি। বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি। আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য। অতিদূর সমুদ্রের'পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা,
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,
তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে। বলেছে সে"এতোদিন কোথায় ছিলেন?"
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে চাওয়া নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে। ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল।
পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন,
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।
সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী। ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন।
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
বিস্তৃত স্মৃতি
কায়কোবাদ
কৃষ্ণার সৈকতে ক্ষুদ্র শ্যামল প্রান্তরে
বসি বৃদ্ধ বালানাথ কঁাদিছে নীরবে;
কত যে বিস্তৃত স্মৃতি হৃদয়ের তলে
উঠিছে জাগিয়া, ক্রমে মানস নয়নে
ভাসিছে নৈরাশ্যপূর্ণ বিগত জীবন।
দূরে রাখালের গান ধেনু রব সনে
মিশিয়াছে কি সুন্দর ঢালিয়া যতনে
ভাবময়ী প্রকৃতির অতৃপ্ত মরমে
অনন্ত কবিত্বপূর্ণ শান্তি-পরিমল।
অস্তোন্মুখে দিনমণি, বসুধার বুকে
পড়েছে সায়াহ্ন ছায়া, প্রকৃতি সুন্দরী
দুই বেশে সুসজ্জিত--- চারু ভয়ঙ্কর।
--- একদিকে স্বর্ণকান্তি, অন্য দিকে ঘোর
কৃষ্ণ বেশ প্রলয়ের পূর্ব নিদর্শন।
পশ্চিমে অতুল শোভা, সিন্দুরে মন্ডিত
নভঃস্থল পূর্ব দিক গ্রাসিছে তিমির
ধূম্রবর্ণ--- একাকৃতি গগন ভুতল।
তাহে কৃষ্ণা ভয়ঙ্করী অতি দীর্ঘকায়
মিশিয়াছে সেই সনে, আরো ভয়ঙ্কর।
বালানাথ ক্ষুণ্ণ প্রাণে বসিয়া নীরবে
কত যে কঁাদিলা স্মরি অতীত জীবন
কাতরে করুণ কন্ঠে কহিলা কঁাদিয়া,
"দয়াময়, অভাগারে কেন নিরদয়?
যে নাম স্মরিয়া নাথ কত যে পতিত
লভিল উদ্ধার, হায় সে নাম স্মরিয়া
ভাসিবে কি এ অভাগা নয়নের জলে?
তুমি ত সকলি জান ওহে দয়াময়,
এ জীবনে ভ্রমেও যে করিনি কখন
পাপ পথে বিচরণ, তবু কেন নাথ,
অভাগার শিরে হেন অশনি সম্পাত?
জীবনের ধ্রুবতারা, নয়নের মণি
স্নেহের দুহিতা সেই হিরণ আমার
শৈশবেই মাতৃহীনা, কত যে যন্ত্রণা
ভুগিয়াছে অভাগিনী শৈশব জীবনে
মাতৃ অনুরোধে তার মারাঠা গুরুর
যোগাশ্রমে, শৈশবেই দিয়াছিনু সঁপে
ভৈরবীর হাতে তারে, ভ্মব্রহ্মচর্য ব্রত
দিতে শিক্ষা, সেই হতে আছে সে সেখানে।
স্নেহের লবঙ্গলতা ভগিনেয়ী মম
ত্যাজিয়াছে প্রাণ এই তটিনীর জলে?
দুঃখিনী জননী তার প্রতি অত্যাচারে
রোষে ক্ষোভে আত্মহত্যা করিয়াছে হায়
কঁাদাইতে বৃদ্ধ কালে এই অভাগারে।
কি কুক্ষণে অলকারে দেখিয়া রঘুজী
ভুলেছিল রূপে তার, পতঙ্গের মত্
ঝম্প দিয়া রাক্ষসীর গুপ্ত প্রেমানলে
মজিল আপনি, হায় মজাল সংসার।
হতভাগ্য না মজিলে অলকার প্রেমে
মরিত কি ভার্যা তার? তটিনীর জলে
মরিত কি মাতৃহীনা লবঙ্গ আমার?
এত জ্বালা দয়াময় সহিব কেমনে?
নিরুদ্দেশ এক মাত্র জ্যেষ্ঠ সহোদর
শান্তজী, কে জানে আজ মৃত কি জীবিত?
দীনা হীনা ভার্যা তার পুত্রকন্যা সনে
স্বামীর বিচ্ছেদে, গেলা তীর্থ পর্যটনে
ভগ্ন হৃদে, এ জনমে ফিরিল না আর।
অভাগার একমাত্র পুত্র প্রিয়তম
শম্ভুজী, অদৃষ্ট দোষে সেও নিরুদ্দেশ
সেই সনে, বঁেচে আর আছে কি জীবনে?
কত দেশ, কত তীর্থ কাননে প্রান্তরে
কত লোক পাঠাইনু, এ জীবনে হায়,
কোন স্থান কোন তত্ত্ব মিলিল না আর
রোগে শোকে ক্লিষ্ট আমি, এ ভুজ দুর্বল
কেমনে ধরিব অসি এ মহা সমরে?
পুত্র ভার্যা শোকে আমি উন্মাদের প্রায়,
কে বোঝে তা? সকলেই সমর উল্লাসে
উল্লসিত, সুসজ্জিত সংগ্রামের তরে।
শান্তি যে কি, মহারত্ন মানব জীবন
কেমনে বুঝিবে তাহা মোস্লেম বর্বর?
তাহারাই এ ভারতে অনর্থের মূল
সসৈন্যে প্রেরিত দত্ত মোস্লেম সংগ্রামে
কে জানে কি আছে ভাগ্যে জয় পরাজয়?"
বৃদ্ধের হৃদয়ে জল বুদ্বুদের মত
কত কথা কত ভাব উঠিছে মিশিছে
পলে, পলে, হৃদয়ে অশান্তি বশতঃ
জাগিয়াও বৃদ্ধ যেন দেখিছে স্বপন;---
একটি সুবর্ণ রথে করি আরোহণ
বহু দূর, শূন্য পথে ত্রিদিবের দ্বারে
উপনীত, পাপপূর্ণ সংসারের মত
নাহি সেথা কোলাহল যন্ত্রণা ভীষণ?
হেন কালে মাঝি এক বসিয়া আনন্দে
অদূরে সৈকত পার্শ্বে তরণীর'পরে
গাইল সংগীত এক অতি সুমধুর---
দে জল দে জল বলি, কেনরে কঁাদিস তুই
ওরে বোকা পাখি।
কে তোরে দিবেরে জল এ যে মহামরু-স্থল,
এখানে সকলি হায় ফঁাকি।
ভাঙ্গিল বৃদ্ধের মোহ শুনিলা নীরবে
সে সুধা-সঙ্গীত সুরে করিয়া কম্পিত
নৈশ প্রকৃতিরে, মাঝি গাইছে উল্লাসে।
দে জল দে জল বলি, কেনরে কঁাদিস তুই
ওরে বোকা পাখি।
কে তোরে দিবেরে জল, এ যে মহামরু-স্থল,
এখানে সকলি হায় ফঁাকি।
ওরে বোকা পাখি।
কি সুধা ঢালিস্ তুই ও করুণ স্বরে।
কি যেন হারানো কথা, প্রাণের লুকানো ব্যথা,
জেগে উঠে আমার অন্তরে।
পাখিরে!---
শুনিলে সে শোকগাথা, প্রাণে উঠে কত কথা,
তুই কি বুঝিবি পাখি
এ হৃদি যা করে?
পাখিরে!
বনের বিহগ তুই,
থাকিস্ সতত ঘোর বনে।
তুই কি বুঝিবি পাখি, কত দুঃখ কত ব্যথা
আমার এ মনে?
পাখিরে!---
আমারি মতই তুই আশাভগ্নে, অর্ধমৃত প্রায়।
আমারি মতন তুই, গৃহত্যাগী বনবাসী হায়!
আমারি মতন তোর, কেঁদে কেঁদে গেল দুটি আঁখি,
তাই কি আকুল প্রাণে, লুকায়ে বিজন বনে,
কঁাদিস্ সতত তুই পাখি।
পাখিরে!---
আপন বলিতে তোর, বুঝি এ ধরণী তলে,
নাই আর কেহ!
ভিজিলে বৃষ্টির জলে, সূের্যর কিরণ তলে,
মাথাটি রাখিতে নাহি গেহ!
দে জল দে জল বলি, তাই কঁাদিস তুই
আকুল পরাণে!
কে তোরে দিবেরে জল, এ যে মহামরু-স্থল,
জল তুই পাইবি কেমনে?
সঙ্গীতের প্রতি শব্দে, প্রত্যেক উচ্ছ্বাসে
ঝরিতে লাগিল যেন মুক্তা রাশি রাশি
আঁধার তটিনী গর্ভে সৈকত প্রান্তরে,
নৈশ প্রকৃতির মুগ্ধ অতৃপ্ত হৃদয়ে।
নীরবে সে বালানাথ বসিয়া সৈকতে
দেখিলা কৃষ্ণার জলে নৈশ অন্ধকারে
নিস্তব্ধ তরণী'পরে অসংখ্য প্রদীপ
জ্বলিতেছে, প্রতিবিম্ব সলিল দর্পণে
শোভিছে কি মনোহর স্বর্ণ-রেখা প্রায়
সারি সারি, কেঁপে কেঁপে হিল্লোলে হিল্লোলে।
বঙ্গবাণী
আবদুল হাকিম
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।
সে সবে কহিল মোতে মনে হবিলাষ॥
তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।
নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন॥
আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।
দেশী ভাষা বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ॥
আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।
যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত॥
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন॥
সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।
বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী॥
মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।
হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ॥
যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি॥
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়॥
মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি॥
বাবুরাম সাপুড়ে
আবোল তাবোল --- সুকুমার রায়
বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস্ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা---
যে সাপের চোখ্ নেই, শিং নেই, নোখ্ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্ফাঁস্, মারে নাকো ঢুঁশ্ঢাঁশ,
নেই কোনো উত্পাত, খায় শুধু দুধ ভাত---
সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন্ তো!
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা ক'রে দিই ঠাণ্ডা।
ভুতুড়ে খেলা
আবোল তাবোল --- সুকুমার রায়
পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে,
পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছ্নাতে।
কচ্ছে খেলা মায়ের কোলে হাত-পা নেড়ে উল্লাসে,
আহ্লাদেতে ধুপধুপিয়ে কচ্ছে কেমন হল্লা সে।
শুনতে পেলাম ভুতের মায়ের মুচকি হাসি কট্কটে---
দেখছে নেড়ে ঝুন্টি ধ'রে বাচ্চা কেমন চট্পটে।
উঠছে তাদের হাসির হানা কাষ্ঠ সুরে ডাক ছেড়ে,
খ্যাঁশ্ খ্যাঁশানি শব্দে যেন করাত দিয়ে কাঠ চেরে!
যেমন খুশি মারছে ঘুঁষি, দিচ্ছে কষে কানমলা,
আদর ক'রে আছাড় মেরে শূন্যে ঝোলে চ্যাং দোলা।
বলছে আবার, ``আয় রে আমার নোংরামুখো সুঁটকো রে,
দেখ না ফিরে প্যাখ্না ধরে হুতোম-হাসি মুখ করে!
ওরে আমার বাঁদর-নাচন আদর-গেলা কোঁত্কা রে,
অন্ধবনের গন্ধ-গোকুল, ওরে আমার হোঁত্কা রে!
ওরে আমার বাদলা রোদে জষ্ঠি মাসের বিষ্টি রে,
ওরে আমার হামান-ছেঁড়া জষ্ঠিমধুর মিষ্টি রে।
ওরে আমার রান্না হাঁড়ির কান্না হাসির ফোড়নদার,
ওরে আমার জোছ্না হাওয়ার স্বপ্নঘোড়ার চড়নদার।
ওরে আমার গোবরাগণেশ ময়দাঠাসা নাদুস্ রে,
ছিঁচকাঁদুনে ফোক্লা মানিক, ফের যদি তুই কাঁদিস রে---''
এই না বলে যেই মেরেছে কাদার চাপটি ফট্ ক'রে,
কোথায়-বা কি, ভুতের ফাঁকি--- মিলিয়ে গেল চট্ ক'রে!
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
বাঁশি
পরিশেষ --- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কিনু গোয়ালার গলি।
দোতলা বাড়ির
লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
পথের ধারেই।
লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।
মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
সিদ্ধিদাতা গণেশের
দরজার 'পরে আঁটা।
আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব
এক ভাড়াতেই,
সেটা টিকটিকি।
তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,
নেই তার অন্নের অভাব॥
বেতন পঁচিশ টাকা,
সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।
খেতে পাই দত্তদের বাড়ি
ছেলেকে পড়িয়ে।
শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,
সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি,
আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।
এঞ্জিনের ধস্ ধস্,
বাঁশির আওয়াজ,
যাত্রীর ব্যস্ততা,
কুলি-হাঁকাহাঁকি।
সাড়ে-দশ বেজে যায়,
তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার॥
ধলেশ্বরী-নদীতীরে পিসিদের গ্রাম---
তাঁর দেওরের মেয়ে,
অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।
লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল---
সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।
মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,
আমি তথৈবচ।
ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া---
পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর॥
বর্ষা ঘনঘোর।
ট্রামের খরচা বাড়ে,
মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।
গলিটার কোণে কোণে
জমে ওঠে, পচে ওঠে
আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,
মাছের কান্কা,
মরা বেড়ালের ছানা---
ছাইপাঁশ আরো কত কী যে।
ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া
মাইনের মতো,
বহু ছিদ্র তার।
আপিসের সাজ
গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,
সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।
বাদলের কালো ছায়া
স্যাঁত্সেঁতে ঘরটাতে ঢুকে
কলে পড়া জন্তুর মতন
মূর্ছায় অসাড়!
দিনরাত, মনে হয়, কোন্ আধমরা
জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।
গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু---
যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,
বড়ো বড়ো চোখ,
শৌখিন মেজাজ।
কর্নেট বাজানো তার শখ।
মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে
এ গলির বীভত্স বাতাসে---
কখনো গভীর রাতে,
ভোরবেলা আলো-অন্ধকারে,
কখনো বৈকালে
ঝিকিমিকি আলো-ছায়ায়।
হঠাত্ সন্ধ্যায়
সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,
সমস্ত আকাশে বাজে
অনাদি কালের বিরহবেদনা।
তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে
এ গলিটা ঘোর মিছে
দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো।
হঠাত্ খবর পাই মনে,
আকবর বাদশার সঙ্গে
হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।
বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
এক বৈকুণ্ঠের দিকে॥
এ গান যেখানে সত্য
অনন্ত গোধুলিলগ্নে
সেইখানে
বহি চলে ধলেশ্বরী,
তীরে তমালের ঘন ছায়া---
আঙিনাতে
যে আছে অপেক্ষা ক'রে, তার
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর॥
বলাকা
বলাকা --- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সন্ধ্যারাগে-ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা
আঁধারে মলিন হল, যেন খাপে ঢাকা
বাঁকা তলোয়ার!
দিনের ভাঁটার শেষে রাত্রির জোয়ার
এল তার ভেসে-আসা তারাফুল নিয়ে কালো জলে;
অন্ধকার গিরিতটতলে
দেওদার-তরু সারে সারে;
মনে হল, সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে,
বলিতে না পারে স্পষ্ট করি---
অব্যক্ত ধ্বনির পুঞ্জ অন্ধকারে উঠিছে গুমরি॥
সহসা শুনিনু সেই ক্ষণে
সন্ধ্যার গগনে
শব্দের বিদ্যুত্ছটা শূন্যের প্রান্তরে
মুহূর্তে ছুটিয়া গেল দূর হতে দূরে দূরান্তরে।
হে হংসবলাকা,
ঝঞ্ঝামদরসে-মত্ত তোমাদের পাখা
রাশি রাশি আনন্দের অট্টহাসে
বিস্ময়ের জাগরণ তরঙ্গিয়া চলিল আকাশে।
ওই পক্ষধ্বনি,
শব্দময়ী অপ্সররমণী,
গেল চলি স্তব্ধতার তপোভঙ্গ করি।
উঠিল শিহরি
গিরিশ্রেণী তিমিরমগন,
শিহরিল দেওদার-বন॥
মনে হল, এ পাখার বাণী
দিল আনি
শুধু পলকের তরে
পুলকিত নিশ্চলের অন্তরে অন্তরে
বেগের আবেগ।
পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ;
তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি
মাটির বন্ধন ফেলি
ওই শব্দরেখা ধ'রে চকিতে হইতে দিশাহারা,
আকাশের খুঁজিতে কিনারা।
এ সন্ধ্যার স্বপ্ন টুটে বেদনার ঢেউ উঠে জাগি
সুদূরের লাগি,
হে পাখা বিবাগি!
বাজিল ব্যাকুল বাণী নিখিলের প্রাণে---
হেথা নয়, হেথা নয়, আর কোন্খানে!'
হে হংসবলাকা,
আজ রাত্রে মোর কাছে খুলে দিলে স্তব্ধতার ঢাকা।
শুনিতেছি আমি এই নিঃশব্দের তলে
শুন্যে জলে স্থলে
অমনি পাখার শব্দ উদ্দাম চঞ্চল।
তৃণদল
মাটির আকাশ-প'রে ঝাপটিছে ডানা;
মাটির আঁধার-নীচে, কে জানে ঠিকানা,
মেলিতেছে অঙ্কুরের পাখা
লক্ষ লক্ষ বীজের বলাকা,
দেখিতেছি আমি আজি---
এই গিরিরাজি
এই বন চলিয়াছে উন্মুক্ত ডানায়
দ্বীপ হতে দ্বীপান্তরে, অজানা হইতে অজানায়।
নক্ষত্রের পাখার স্পন্দনে
চমকিছে অন্ধকার আলোর ক্রন্দনে॥
শুনিলাম মানবের কত বাণী দলে দলে
অলক্ষিত পথে উড়ে চলে
অস্পষ্ট অতীত হতে অস্ফুট সুদূর যুগান্তরে।
শুনিলাম আপন অন্তরে
অসংখ্য পাখির সাথে
দিনে রাতে
এই বাসাছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে
কোন্ পার হতে কোন্ পারে
ধ্বনিয়া উঠিছে শুন্য নিখিলের পাখার এ গানে---
`হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্ খানে!'
প্রশ্ন
পরিশেষ --- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে---
তারা বলে গেল `ক্ষমা করো সবে', বলে গেল `ভালোবাসো---
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো'।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তার, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে॥
আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপটরাত্রি-ছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি--- প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রনায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে॥
কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,
অমবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃসপ্নের তলে।
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে---
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?।
পুরস্কার
সোনার তরী --- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে
কহিল কবির স্ত্রী
`রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো,
রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো,
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো,
তার খোঁজ রাখ কি!
গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব---
মাথা ও মুণ্ড, ছাই ও ভস্ম,
...